১৯৭১ সালের এক নভেম্বরের সন্ধ্যায়, একজন ব্যক্তি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার নর্থওয়েস্ট অরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ছোট ফ্লাইটে পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটল শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তার গায়ে ছিল গাঢ় কালো রঙের স্যুট এবং হাতে একটি কালো ব্রিফকেস, সেদিন তিনি ইতিহাসে নিজের নাম লেখান এক রহস্যময় চরিত্র হিসেবে। তবে তার আসল নাম আজো অজানা। টিকেট কাটার সময় জাল পাসপোর্টে নিজের নাম লিখেছিলেন ড্যান কুপার। ভুলবশত পরবর্তীতে তিনি পরিচিত হলেন ডি.বি. কুপার নামে, এবং হয়ে ওঠেন আমেরিকার সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধী। সেদিন রাতে তিনি ২ লাখ ডলার মুক্তিপণ নিয়ে ঝড়ো আকাশে বিমান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাকে আর কেউ কোনোদিন খুঁজে পায়নি।

১৯৭০ এর দশকে আকাশপথে ছিনতাই কোনও বিরল ঘটনা ছিল না। তবে ড্যান কুপারের ছিনতাইয়ের ধরণ ছিল একেবারেই ভিন্ন, অদ্ভুত রকমের শান্ত। বিমান আকাশে উঠতেই তিনি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ফ্লোরেন্স শ্যাফনারকে একটি কাগজ ধরিয়ে দেন। প্রথমে ফ্লোরেন্স ভেবেছিলেন এটি হয়তো ড্যানের ফোন নম্বর। কিন্তু চিরকুটটিতে লেখা ছিল, “আমার কাছে একটি বোমা আছে।”

তারপর ব্রিফকেস খুলে ড্যান ডাইনামাইট সদৃশ কিছু বোমা দেখান এবং খুবই শান্তভাবে দাবি জানান যে তাকে নগদ ২ লাখ ডলার ও চারটি প্যারাশ্যুট দিতে হবে। আর তার জন্য সিয়াটলে বিমান নামার পর একটি ফুয়েল ট্রাক প্রস্তুত রাখা লাগবে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, তিনি কোনও হট্টগোল করেননি। যাত্রীদের সঙ্গে ছিলেন খুবই ভদ্র ও নম্রভাষী, এমনকি তাদের কেউ টেরও পাননি যে তারা একটি ছিনতাই হওয়া বিমানে বসে আছে। সিয়াটলে নামার পর ডলার ও প্যারাশ্যুট হাতে পেয়ে ড্যান যাত্রীদের নামার অনুমতি দেন।

তবে ক্রুদের জিম্মি করে রাখেন এবং নির্দেশ দেন পুনরায় উড্ডয়ন করতে দক্ষিণে মেক্সিকো সিটির পথে।

বিমানকে ড্যান অস্বাভাবিক কম উচ্চতায় একটি নির্দিষ্ট গতিতে রাখতে বলেন এবং পেছনের দরজা খুলে দিতে বলেন। ওয়াশিংটনের ঘন জঙ্গলের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রবল বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যে ড্যান কুপার টাকা কোমরে বেঁধে প্যারাশুট পরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবং তারপর থেকেই তিনি ইতিহাসের পাতায় নিখোঁজ।

এফবিআই ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করে যার নাম দেয়া হয় নরজ্যাক (নর্থওয়েস্ট হাইজ্যাকিং)।

শত শত সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, প্রতিটি ডলার নোটের খোঁজ করা হয়, প্যারাশ্যুটের মাধ্যমে সম্ভাব্য জায়গা যেখানে ড্যান নামতে পারে তা চষে ফেলা হয়। কিন্তু ড্যানের কোনও হদিসই পাওয়া যায়নি। দেহ, প্যারাশ্যুট কিছুই না। ড্যান কুপার যেন জাদুকরের মতন হাওয়ায় মিশে যান।

তবে ১৯৮০ সালে এক কিশোর কলম্বিয়া নদীর তীরে ক্যাম্পিং করার সময় ৫ হাজার ৮০০ ডলার ভিজে পচে যাওয়া অবস্থায় খুঁজে পায়। এগুলো কুপারের মুক্তিপণের অংশ হিসেবেই চিহ্নিত হয়।

কিন্তু এরপর রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। তবে কি কুপার মারা গিয়েছে? যদি তিনি মারা যান তবে তার দেহ কিংবা বাকি টাকাগুলো কোথায়? আর যদি বেঁচেই থাকেন কুপার, তবে কেন তার কোনও প্রমাণ নেই?

ইতিহাসে ডি.বি. কুপার নামে জনপ্রিয় হলেও টিকিটে লেখা ছিল ড্যান কুপার। ধারণা করা হয় যে, এটি হয়তো একটি ফরাসি-কানাডিয়ান কমিকস চরিত্র থেকে নেওয়া, যে ছিল একজন প্যারাট্রুপার। কিন্তু এক সাংবাদিক এফবিআই এর ব্রিফিং ভুল শুনে লিখে ফেলেন 'ডি.বি.।' তারপর থেকেই রহস্যময় ছদ্মনামটি তার সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

অসংখ্য সন্দেহভাজন থাকলেও কারো বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দশকের পর দশক ধরে নানা সন্দেহভাজনের নাম উঠে এসেছে যার মধ্যে রয়েছে অভিজ্ঞ সাবেক সেনা প্যারাট্রুপারও। রয়েছে নানা অপরাধী ও ভবঘুরে, যাদের চেহারা বা অতীত ড্যান কুপারের সঙ্গে মিলেছে। এমনকি একজন নারী দাবি করেছিলেন, তার মৃত স্বামীই নাকি ছিলেন ড্যান কুপার। কিন্তু কোনও দাবিই প্রমাণিত হয়নি। অবশেষে ২০১৬ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডি.বি. কুপার শুধু অপরাধী নন, বরং এক ধরনের লোককথার নায়ক হয়ে ওঠেন। তিনি কাউকে বিন্দুমাত্র আঘাত করেননি কিন্তু সরকারকে ও আইনকে ঠিকই ফাঁকি দিয়ে চিরতরে অদৃশ্য হতে পেরেছিলেন।

তাই কেউ কেউ তাকে বিদ্রোহের প্রতীক মনে করে, কেউ বা আবারও মনে করে আধুনিক যুগের এক ভূতের গল্প হিসেবে। তিনি কি সত্যিই নিরাপদে অবতরণ করেছিলেন, নাকি জঙ্গলে প্রাণ হারিয়েছিলেন? উত্তর আজও অজানা।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবুও ডি.বি. কুপারকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল কমেনি। তিনি ইতিহাসের সেই বিরল এক ব্যক্তি যিনি চলন্ত বিমানের ভেতর থেকে অর্থভর্তি ব্যাগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন।

হয়তো এই অজানাই তাকে অমর করে রেখেছে। ডি.বি. কুপার হয়ে গিয়েছেন এক কিংবদন্তি যিনি বিমানে উঠেছিলেন একজন সাধারণ যাত্রী হিসেবে আর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পলাতক হিসেবে।

samiulhaquesami366@gmail.com