Bangla
3 months ago

স্যান্ডউইচ শহরে স্যান্ডউইচের জন্মকথা

Published :

Updated :

ত্রিকোণাকারে দুই টুকরো পাউরুটির মাঝে মাংস, ডিম কিংবা সবজির পুরে আমাদের হাতে ওঠে সুস্বাদু খাবার স্যান্ডউইচ। আরেকটু স্বাদ বাড়াতে পাশ্চাত্য এই খাবারটির সাথে থাকে মায়োনিজ, টমেটো কিংবা সরিষার সস। মুখে পুরলে নিমিষেই শেষ।

চটজলদি এই নাস্তা স্কুলের টিফিনে, আপিসের মধ্যাহ্নভোজে, চা-পার্টি বা পিকনিকে বেশ চলনসই। তাই শুনতে বসা যাক এই ব্যস্ত জীবনের আহারের জন্মকথা।

১৭৬২ সাল। দক্ষিণ-পূর্ব ব্রিটেনের কেন্ট প্রদেশের ছোট্ট শহর স্যান্ডউইচ। জন মন্টেগু তখন স্যান্ডউইচের চতুর্থ আর্ল। আর্ল হলো সম্ভ্রান্ত একটি উপাধি যা মন্টেগু পরিবারের উত্তরাধিকারীরা বহন করতেন। তারা জনসমাজে খুব সম্মানিত মানুষ ছিলেন।

স্যান্ডউইচের চতুর্থ আর্ল মহাশয় রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন বটে, কিন্তু সারাটা দিন পড়েই রইতেন জুয়াখেলার ঘরে। তার ধ্যান-জ্ঞান ওই তাস পেটানো, নাওয়া-খাওয়া ভোলার জোঁ। জুয়াতে সিদ্ধহস্ত মন্টেগু তার ভৃত্যদের নির্দেশ করলেন মাংস বা পনির খাবারে যাই থাকুক তা যেন রুটির মাঝে ভরে পরিবেশিত হয় যাতে করে তিনি একহাতে খেতে পারেন আর আরেক হাতে তাস পেটাতে পারেন।

সে অনুযায়ী জুয়ার টেবিলে পৌঁছে যেতো দুই টুকরো পাউরুটির মাঝখানে ফালি করা ঝলসানো গোমাংস। এভাবে তাস পিটিয়ের উপাধির জের ধরে এই নতুন খাবারটি স্যান্ডউইচ নাম পেল। অবশ্য শোনা যায়, তুর্কি ভ্রমণের সময় জন মন্টেগু এরকম রুটির মাঝে খাবার পরিবেশনের ধারণা পেয়েছিলেন। 

তবে সে যাই হোক স্যান্ডউইচ পোশাকি নামে খাবারটি ১৮শ শতকে ইউরোপে জন্ম লাভ করেও শত বছর ঘুরে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে আমেরিকানদের হাত ধরেই। আর সেই সাথে নানান দেশের নানান ভাষায় স্যান্ডউইচ শব্দটিরও আত্তিকরণ হয়ে গেছে। 

সমগ্র আমেরিকা জুড়ে রোজ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের স্যান্ডউইচ বিক্রি হয়। কারণ ব্যস্ত জীবনে তাড়াতাড়ি খাবারের পালাটা সেরে নিতেই স্যান্ডউইচের জন্ম। তাই দ্রুতই এটি জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়।

প্রথম প্রথম এই ত্রিকোণা রূপটি ছিল না। চৌকোণা পাউরুটির মাঝেই দেয়া হতো সকল উপকরণ। নাম ছিল মাউথ ডিসটোরটার । খাবারটি জনপ্রিয়তা লাভের সাথে সাথেই নানান স্যান্ডউইচ প্রস্তুতকারকদের মাঝে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

শুরুর দিকের ব্রিটিশ স্যান্ডউইচগুলোতে নানান বৈচিত্র্য পাওয়া যেতো। গমের রুটি, রাইয়ের রুটি, নানান শস্যের মিশেলের রুটি, পটেটো ব্রেড, ফোকাসিয়া, ফ্রেঞ্চ রুটিসহ নানান পদের পাউরুটির ব্যবহার ছিল। হাড়ের মজ্জা, ন্যাস্টাটারিয়াম, উডকুক, ছোট্ট ছোট্ট মিষ্টি রুটি, কালে আর ব্রান্ডিতে সিক্ত কমলার টুকরো, এমনি সব বিচিত্র উপাদানে ভরা হতো মাঝটা।

সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ বিক্রেতা ছিল ইসাবেলা বিটন। তিনি নুন আর গোলমরিচ ছড়ানো টোস্ট করা স্যান্ডউইচের ধারণা নিয়ে আসেন। যেটি ১৯২০ সালে যান্ত্রিক টোস্টার আবিষ্কারের পরে বহুল লোকপ্রিয় হয়। 

সারা বিশ্ব ঘুরে স্যান্ডউইচ কুড়িয়েছে নানান উপকরণের সাজ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা খোলা স্যান্ডউইচ উদ্ভাবন করে, অর্থাৎ এক টুকরো পাউরুটির উপরেই মাংস আর সবজি দিয়ে পরিবেশন। এর কথা জানা যায় ১৯৬০ সালে এক ব্রিটিশ লেখকের লেখাতে।

এখন স্যান্ডউইচ ছোট-বড় নানা মাপে আর নানা স্বাদে হয়। পাওয়া যায় নানান নামে- ট্র্টস, সাব, ক্লাব, গ্রিলিড, পানিনি, কিউবিন, হ্যাম, টার্কি, বেকন স্যান্ডউইচ। আমরা এশিয়ানরাও আমাদের স্যান্ডউইচ তৈরি করেছি হাতের কাছের সহজলভ্য সিদ্ধ মাংসের টুকরো, সিদ্ধ ডিম বা সবজিতে। 

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্যান্ডউইচ প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম কিন্তু সেই ‘আর্ল অব স্যান্ডউইচ’ । এর শাখা আছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, ফ্রান্স, ফিলিপাইনস আর দক্ষিণ কোরিয়াতে।  ৩রা নভেম্বর বিশ্ব স্যান্ডউইচ দিবস পালিত হয়, এই দিনটিও কিন্তু সেই আর্ল জন মন্টেগুর জন্মদিবস। 

[email protected] 

Share this news