Bangla
3 months ago

অযত্নে, অবহেলায় নারিন্দার 'ঢাকা খ্রিস্টান কবরস্থান'

Published :

Updated :

ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো এবং সর্ববৃহৎ খ্রিস্টান কবরস্থান নারিন্দায় অবস্থিত, যা ‘ঢাকা খ্রিস্টান কবরস্থান, ওয়ারী’ নামে পরিচিত। এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মী থেকে শুরু করে ওলন্দাজ, আর্মেনিয়ান এবং চীনা নাগরিকদের কবর ছাড়াও আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত হওয়া শত ইংরেজ সৈনিকের গণকবর।

প্রায় চারশ বছরের বেশি বয়স এই সমাধিক্ষেত্রের। মুল গেট দিয়ে ঢুকে কেয়ারটেকারের রুমের পাশ ঘেষে পায়ে চলা সোজা একটি রাস্তা, সামনেই সাদা বিশাল তোড়ন। দুপাশে সাড়ি সাড়ি অনেকগুলো প্রাচীন সমাধি। কিছু সমাধির বয়সকাল ইউরোপিয়ানদের বাংলা দখলেরও পূর্বের। সমাধি ফলকগুলোর এপিটাফ মুছে গিয়েছে। সন-তারিখ কোনকিছুই ভালো বোঝা যায়না। জরাজীর্ন ফলকে শ্যাওলার আস্তরন। এক নির্জন অনুভূতি জাগানো এই পরিবেশ মনে করিয়ে দেয় জীবনের বর্ণিল বার্তার শেষ অনুক্ষণ এখানেই।

ভারতবর্ষে উপনিবেশিক অনেক ইউরোপিয়ান শক্তি ছিল, কিন্তু অভিবাসী বোধহয় শুধু আর্মেনিয়ানরা। তারা বঙ্গভূমিতে পদার্পন করে শোষন করতে নয়, বরং বানিজ্য ও বসতি স্থাপন করতে। ঢাকার আরমানীটোলা কিংবা নারিন্দাতেই তাদের বেশিরভাগ স্থায়ী হয়। আর্মেনিয়ানরা খ্রিস্টান হলেও সময়ের পরিক্রমায় তারা মুসলিম ধারার কাছাকাছি উপায়ে মৃতের সমাধিস্থ করতেন। 

নারিন্দা সমাধিক্ষেত্রটির পাশেই এই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য ঢাকার প্রথম গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয় যা এখন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তবে পাদ্রী সেবাস্তিয়ান মানরিক ১৬২৪ থেকে ১৬২৯ সালের মধ্যে ঢাকা পর্যটনে এসে গির্জা দেখেছিলেন। ফরাসি পরিব্রাজক জ্যঁ বাপ্তিস্ত তাভারনিয়ে ১৬৬৬ সালে এবং এর পরপরই নিকোলো মেনুচি ঢাকা সফর করেন। তাদের দুজনের ভাষ্যমতেও এখানে গীর্জার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তাই ধরা হয়, পর্তুগিজ অগাস্টানিয়ানরা গির্জাটি তৈরি করেছিলেন, এবং বর্তমান সমাধিক্ষেত্রটি ছিল মূলত সেই গির্জা সংলগ্ন কবরস্থান, যাকে ইংরেজিতে বলে চার্চ গ্রেভইয়ার্ড।

কালের পরিক্রমায় ক্ষয়ে যাওয়া কবর ফলকগুলো দেখে জানা যায় এখানে শায়িত আছেন কলকাতার মন্ত্রী রেভারেন্ড জোসেফ প্যাজেট, যিনি ১৭২৪ সালে ২৬ বছর বয়সে মারা যান। আরও রয়েছেন ১৭২৫ সালে মারা যাওয়া ইংরেজ কুঠির প্রধান ন্যাথানিয়েন হল। 

সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিও বহন করছে এই সমাধিক্ষেত্র। সিপাহী বিদ্রোহে নিহত দুই সৈনিকের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে এখানে, সদর দরজার বাঁ দিকে, একদম পথের শুরুতেই। এর মধ্যে এখনও বেশ চেনা যায় হেনরি স্মিথের সমাধি, ২২ নভেম্বর বিদ্রোহের দিন তিনি নিহত হন। এছাড়াও যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত সেনা নেইল ম্যাকমুলেন ও জেমস মুরস ২৩ নভেম্বর এবং উইলিয়াম এসডেন ও রবার্ট ব্রাউন ২৪ নভেম্বর মারা যান।

সমাধিক্ষেত্রের প্রবেশমুখ

এই সমাধিক্ষেত্রেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন পোগোজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার নিকোলাস পোগোজ। যিনি ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ব্যাংকের একজন পরিচালক ছিলেন। পরবর্তিতে তিনি ১৮৭৪ সালে ঢাকা পৌরসভার কমিশনারও হন। তার পাশাপাশি এই সমাধিক্ষেত্রেই সমাধিস্থ হয়েছেন তার ছেলে পল।

আরও আছেন প্রিয় ডাক্তার সাহেব, ইউরোপিয় চিকিৎসক আলেকজান্ডার সিম্পসনের সমাধি। তিনি ১৮৫৮ সালে যাত্রা শুরু করা মিটফোর্ড হাসপাতালের সুপারিন্টেনডেন্ট। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে পরলোকে চলে যান ঢাকাবাসীর অতি আপনজন সিম্পসন। 

সিম্পসনের কবর

বিখ্যাত গ্রিক ধনাঢ্য পাট ব্যবসায়ী মারকার ডেভিডের স্ত্রী এলিজাবেথের সমাধিও এখানে। তার সমাধিটির উপর রয়েছে পাথরের তৈরি ক্রন্দনরত মা মেরীর মূর্তি। আছে জ্যানেট ভ্যান তাসেলের সমাধিও, নিউ মেক্সিকোতে জন্মানো এই বেলুনিস্ট বেলুনে করে আকাশে নানা রকম খেলা দেখাতেন। পরবর্তিতে ব্রিটিশ শাষিত ভারতবর্ষেও ঢাকার নবাব বাড়িতে খেলা দেখাতে এসে ১৮৯২ সালের ১৬ই মার্চ দুর্ঘটনাবশত বেলুন থেকে পড়ে নিহত হন। ঢাকার নবাবের নির্দেশেই তাঁকে নারিন্দা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 

সমাধিক্ষেত্রের স্থাপত্যশিল্পের তাৎপর্য

একসময় মুসলিম রীতিতে নির্মিত ফটক দিয়েই সাড়ে ছয় একরের ওপর অবস্থিত প্রাচীরঘেরা এই সমাধিক্ষেত্রের মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করতে হতো। এই সমাধিক্ষেত্রে মোট ছয় ধরনের সমাধির দেখা পাওয়া যায়।

টাইপ ধরনের সমাধিগুলো এতই পুরনো যে সেগুলোর কোনো ধ্বংসাবশেষই আর চোখে পড়ে না। অথবা এতই নতুন যে সেগুলোর মৌলিকত্ব নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। সেক্ষেত্রে সমাধিটির আসল অবস্থা দর্শনার্থীদের জন্য পাশেই নির্দেশিত থাকে।

টাইপ বি ধরনের সমাধিগুলোতে মুরীয় ঘরানার তোরণ দেখা যায়, যার অধিকাংশই বহু বছর ধরে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমানের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ধরনের সমাধির নকশা অনেকটা সমতলভূমির কেন্দ্রের ওপর দন্ডায়মান সাধারণ তোরণের মতো।

টাইপ সি, ডি,   এধনের সমাধিফলকগুলো কলকাতার সমসাময়িক ইংরেজ সমাধিগুলোর সাদৃশ্য, যা এখনকার ওবেলিস্ক এবং উর্ন-এর সাথে মিল আছে। সমাধিগুলো ভারতীয় পিরামিডের মতো যা একটি পাকা ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। পাকা ভিত্তিটি সমাধির ওপর তৈরি যার স্মৃতিস্তম্ভ কোণাকুণিভাবে উপরে উঠে একটি চূড়ায় গিয়ে শেষ হয়।

টাইপ এফ এই  সমাধিগুলো সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিচিত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এগুলো বৃত্তাকার নয়, বরং ডোরিক আয়ন কলামের দ্বারা অষ্টভুজ বর্গাকৃতির। ধরনের সমাধিগুলোর মধ্যে কলম্বো সাহেবের সমাধিটি সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক। এই সমাধিটি তিনটি সমাধির সমন্বয়ে গঠিত হলেও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কেন্দ্রীয়ভাবে এই সমাধির কোনো শিলালিপি নেই।

 কারণ এই সমাধির আসল কাঠামো ঋতুগত পরিবর্তন বা অন্যান্য ভৌগোলিক কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। এই সমাধিস্তম্ভটি মোঘল আমলে তৈরী মসজিদসমূহের নকশার গড় পরিকল্পনায় তৈরী। বর্গাকার একটি সমাধির চারদিকে চারটি করে দরজা বিদ্যমান।

‘বিশপ অব ক্যালকাটা’র আগমন

১৮২৪ সালের ২২ জুলাই বিশপ রেজিনাল্ড হেবার ঢাকায় এসে নারিন্দার সমাধিক্ষেত্রের পবিত্রকরণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে তার “Narrative of a Journey through the Upper Provinces of India, From Calcutta to Bombay, 1824-1825” নামক বই প্রকাশিত হয়, যেখানে সমাধিক্ষেত্র সম্পর্কে তিনি জানান,

“কিছু সমাধি খুবই সুন্দর। বিশেষত একটিতে যেখানে মুসলমান পীর-ফকিরদের সমাধির ন্যায় আটকোণা গথিক মিনার দেখা যায়। একই রকম কারুকার্যখচিত গম্বুজ ও আটটি জানালাসহিত।”

কলম্বো সাহেবের সমাধি

হেবার উল্লেখ করেছিলেন প্যাজেটের সমাধির কথা, যা এই সমাধিক্ষেত্রে টিকে থাকা সবচেয়ে পুরনো সমাধি। এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছিলেন ওয়ান্সি কোঁয়া নামক এক চীনা খ্রিস্টানের সমাধির কথাও। ১৭৯৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে মারা যান এই ভদ্রলোক। 

পরে তার সমাধি স্থাপনা গড়ে দেন তারই স্বদেশী সুহৃদ ওয়ানা চৌ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নাম-পরিচয়হীন রহস্যে ঘেরা সমাধিগৃহ ‘কলম্বো সাহেব, কোম্পানি কা নওকার’-এর কবর। এই সমাধির শীর্ষে গম্বুজ আচ্ছাদিত একটি আটকোণা বুরুজও আছে। দেয়ালে রয়েছে বেশ কিছু শিলালিপি। প্রতিদিকে একটি করে দরজা। একদম সামনের দিকে প্যাঁচানো নকশাবিশিষ্ট থাম।

বর্তমানে এই সমাধিক্ষেত্রটি সেন্ট মেরী ক্যাথিড্রালের তত্ত্বাবধানে আছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে, এবং জনসাধারণের অবহেলায় ক্রমেই নিজস্ব এই ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আজ ধ্বংসের মুখে। নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী এই সমাধিক্ষেত্রটি। অথচ বিশপ হেবার প্রায় দু’শ বছর আগেই এই সমাধিক্ষেত্রের বৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন,

“প্রথম দেখাতেই পুরো জায়গাটিকে এত বুনো আর বৈশিষ্ট্যমন্ডিত মনে হয়েছিল যে আমি আফসোস করেছিলাম কেন আমার হাতে একটা ছবি আঁকার মতো যথেষ্ট সময় নেই।”

[email protected]

Share this news